ফুরফুরা শরীফের সিলসিলার প্রতিষ্ঠাতা হযরত শাহ্‌ সুফি মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকী (রহঃ) শুধুমাত্র একজন ধর্মোপদেশকারীই ছিলেন না তিনি যুগের একজন ধর্ম সংস্কারক এবং মোজাদ্দেদ জামান ছিলেন। তিনি ঐ উপাধিতেই বেশী সমাদৃত ছিলেন।

মোজাদ্দেদ জামান আবু বকর সিদ্দিকী (রহঃ) ১৮৪৫ সালে ফুরফুরা শরীফে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি সামাজিক অপরাধগুলো দূরীকরণের লক্ষে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং অসংখ্য সামাজিক কাজকর্মে জড়িত ছিলেন। তিনি অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠান, এতিমখানা এবং বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। তিনি একজন মহান শিক্ষাবিদ ছিলেন, যিনি কিনা উপলব্ধি করেছিলেন যে একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই তিনি এই সমাজ ব্যবস্থার ক্ষতিকর দিকগুলো দূর করতে পারবেন এবং একারনেই তিনি অনেক মাদ্রাসা, স্কুল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফুরফুরা শরীফে সুবিধা বঞ্চিত ছাত্রদের জন্য তিনি বিনা মূল্যে বোর্ডিং সুবিধা দিয়ে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য ফুরফুরা শরীফে মেয়েদেও জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সব সময় বলতেন যে- একজন লেখকের কলম শহীদের চেয়েও উত্তম। তাই তিনি অনেক ইসলামিক পত্রিকা এবং খবর পত্রিকা-কে পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

এগুলোর মধ্যে একটি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা হচ্ছে- মুসলিম হিতৌষী। তিনি একজন দেশপ্রেমিক এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সহিত জড়িত ছিলেন। সু-পন্ডিত এবং সর্বদা সহিষ্ণু আবু বকর সিদ্দিকী (রহঃ) সাহেবের সমগ্র পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, বিহার ও বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) জুড়ে অসংখ্য মুরীদ ও ভক্ত ছিল। তাঁহার অনুসারী ও ভক্তগণ শুধুমাত্র মুসলিম ধর্মেরই ছিলেন না বরং বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মের লোকেরা তাঁহার ভক্ত ছিলেন। তাঁহার কার্যক্রম বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিজীবি কর্তৃক প্রসংশিত ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার দূর্বান থেকে প্রকাশিত দি মুসলিম ডাইজেষ্ট এ আবু বকর সিদ্দিকী (রহঃ) কে- “Illustrious, religious leader- fearless, god intoxicated and selfless as a preacher, he would never attack other religions and endeared himself to people from other communities and castes” ১৯৩৯ সনের ১৭ই মার্চ তিনি তাঁহার পাঁচ পুত্র রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, যাহার প্রত্যেকেই ইসলামী ধর্ম তত্ত্ব বিষয়ে পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন।

Mazaar Sharif At Furfura Sharif

Mazaar Sharif At Furfura Sharif

নায়েবে মুজাদ্দেদ পীরে কামেল কাইউম-এ-জামান আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহঃ) ছিলেন তাঁহার বড় পুত্র। তিনি ধর্মীয় সম্মেলন এবং সেমিনারে অংশগ্রহন করতেন। ধর্মীয় ওয়াজ এর সাথে তিনি সামাজিক কাজ কর্মের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং অনেক সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহার প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা নেদায়ে ইসলাম এখনও প্রকাশিত হচ্ছে।

মোজাদ্দেদ জামান এর দ্বিতীয় পুত্র হচ্ছেন

নায়েবে মুজাদ্দেদ পীরে কামেল মুফতি-ই-আজম আবু জফর সিদ্দিকী (রহঃ), যিনি একজন ইসলামিক পান্ডিত্বের অধিকারী এবং ঐ সময়ের প্রসিদ্ধ লেখক ছিলেন। তিনি ইসলামিক শরীয়া এবং ব্যবহার তত্ত্ব/আইন বিজ্ঞানের উপর শতাধিক বই লিখেছেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সেবা মূলক কাজে উৎসাহিত করতেন

, যেমন মুজাদ্দেদ মিশনের উপদেষ্টা ছিলেন যেটি ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠীত এবং অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মাদ্রাসার পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

নায়েবে মুজাদ্দেদ পীরে কামেল মুজাহিদত-ই-মিল্লাত আব্দুল কাদের সিদ্দিকী (রহঃ) সাহেব হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহঃ) এর তৃতীয় পুত্র। ভক্ত ও মুরীদগণ ধর্মীয় বিভিন্ন সমস্যার আক্ষরিক সমাধান পাওয়ার জন্য উনার বাসায় জড়ো হতেন এবং উনি সমস্যার সমাধান করে দিতেন। তিনি খুবই নম্র ও ভদ্র ছিলেন। অপরের দুঃখ দেখতে পারতেন না। তিনি গরীব এবং পদ-দলিত মানুষকে অনেক সাহায্য সহযোগীতা করেছেন। তিনি মাত্র ৩১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

মোজাদ্দেদ জামান হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহঃ)- এর চতুর্থ পুত্র হচ্ছেন

নায়েবে মুজাদ্দেদ পীরে কামেল সুলতানুল আরেফিন আবু নজম মোহাম্মদ নাজমুস সায়াদাত সিদ্দিকী (রহঃ)। ইসলামিক শিক্ষা অর্জনের পর তিনি মোরাকাবার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চর্চা শুরু করেন। জিকির, জেয়ারত ইত্যাদি। এভাবে তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পান্ডিত্য অর্জন করেন। মানুষ তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতার জ্ঞান অর্জনের জন্য উনার নিকট জড়ো হতেন। তিনিও অনেক সামাজিক কাজ ও সেবা মূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি মোজাদ্দেদ পত্রিকা ও মোজাদ্দেদ মিশন নামে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, যাহা কিনা এখন ও চলছে। হযরত নাজমুস সায়াদাত সিদ্দিকী (রহঃ) নতুন প্রজন্মকে ইংরেজী ভাষাজ্ঞান শিক্ষা উপর গুরুত্ত্ব দিয়েছেন।

নায়েবে মুজাদ্দেদ পীরে কামেল সুলতানুল ওয়ায়েজীন জুলফিকার আলী সিদ্দিকী (রহঃ) হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহঃ)- এর সর্ব কনিষ্ট পুত্র ছিলেন। তাঁর বাগ্মিতা ছিল অসাধারণ। তিনি প্রকাশ্য বক্তৃতা ও ভাষা জ্ঞানের মাধ্যমে প্যারসদেও সম্মোহিত করেছিলেন। তিনিও অবিশ্রান্ত ভাবে বাংলা, আসাম ও বাংলাদেশের সামাজিক উন্নতি এবং ধর্মীয় কারনে বিভিন্ন সম্মেলন, সেমিনারে অংশ গ্রহন করতেন।

২৭ শে অক্টোবর ২০০২ ইং তারিখে মুজাদ্দেদেজামান আবু বকর সিদ্দিকী (রহঃ) এর মধ্যম পুত্রের এন্তেকালের সাথে সাথে একটি প্রজন্মের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহঃ)- এর মিশন এখনও তাঁহার পৌত্ররা এবং উৎসর্গীত মুরিদগণ চালু রেখেছেন। তিনি একটি বাৎসরিক ঈসালে সাওয়াব কায়েম করেন, যাহা কিনা এখনও বাংলা ফাল্গুন মাসের ২১,২২ ও ২৩ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় (ইং আনুমানিক ৫,৬,৭ মার্চ)। প্রতি বছর তাঁর পৌত্ররা এই বাৎসরিক অনুষ্ঠান করে থাকেন এবং এই কাজ বংশানুক্রমে চালু থাকবে, ইনশালস্নাহ্‌ ।

প্রিয় নবী রাহমাতুলিস্নল আলামিন নবীকুলের শিরোমনি হুযুর করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম- এর প্রকৃত নায়েব বা প্রতিনিধি হিসেবে অসাধারণ বেলায়েতী শক্তি ও খোদায়ী জ্যেতির্দ্বীপ্ত ক্ষমতায় বিভিন্ন অব্যর্থ পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে বাতিলের তামাশাকে অপসারিত করে যাঁরা সফলতার উচ্চাসনে সমাসীন হয়েছেন, আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর হাবীব (সাঃ)- এর শাশ্বত ও নিরুপম আদর্শকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতঃ দ্বীন ইসলামের নিষ্কলুষ আধ্যাত্নিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মুর্শিদে বরহাক রাহনুমায়ী তারিকত ওয়াশরিয়াত, গওছে জামান, সুলতানুল আরেফিন, আজন্ম ওলিয়ে কামেল, আলেমে হাক্কানী পীরে রাব্বানী মাওলানা শাহ্‌ সুফি মোহাম্মদ নাজমুস সায়াদাত সিদ্দিকী হযরত ন’হুজুর পীর কেবলা (রহঃ)- অন্যতম। মানবতার অগ্রপথিক, আদর্শ শিক্ষানুরাগী হিসেবে দীর্ঘ দিনের শূন্যতাকে পূরণ করতে এ অঞ্চলের দিকহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে একটি যথোপযুক্ত সময়ে এদেশের স্বধীনতার পূর্বকালে সুদূর ভারতের ফুরফুরা শরীফ থেকে আধ্যাত্নিক জগতের প্রাণ পুরুষ এর বাংলাদেশে সুভাগমন ঘটে। শুরু হয় তরিকতের, শরীয়তের ও মারেফেতের প্রানোচ্ছল স্রোতধারা। এতদ্বঞ্চলের হাক্কানী তরীকত অনুসন্ধানী মানুষ হুজুর কেবলা (রহঃ)- এর সান্নিধ্যে এসে ক্রমান্বয়ে কাদেরীয়া কাদেরীয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দীয়া ও মোজাদ্দেদীয়া তরিকার বায়াত গ্রহন রতে থাকে।

মুসলমানদের দ্বীনি শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহনের সুযোগ করে দিতে হুজুর কেবলা (রহঃ) তাঁর ভক্ত মুরিদানদের সহযোগীতায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ন্যায় বাংলাদেশও গড়ে তোলেন অসংখ্য মাদ্রাসা ও খানকা শরীফ। মানবতার অগ্রপথিক আদর্শ শিক্ষানুরাগী এবং মুন্সিয়াত তথা দ্বীনি সমাজ ব্যবস্থার এই সফল সংগঠকের কার্যক্রমকে বাংলাদেশের সর্বত্র পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে।

হযরত ন’হুজুর কেবলা (রহঃ) ২২শে পৌষ ১৩৮৮, ৭ই জানুয়ারী ১৯৮২, ১১ই রবিউল আউয়াল ১৪০২, বৃহস্পতিবার দুপুর ২-৩০ মিনিটে ৬৯ বৎসর বয়সে ইন্তেকালের পর সিলসিলার মহান খিদমতের গুরুদায়িত্ব হিসাবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন- একমাত্র সাহেবজাদা মোজাদ্দেদ সুলতানজাদা হুজরাতুল আলস্নামা মোহাম্মদ সেবগাতুল্লাহ্‌ সিদ্দিকী (মাদ্দাজিল্লাহুল আলী)।

বর্তমান ছোট সাহেবজাদা (দামা ইকবালুহু) তাঁর মূল্যবান নসিহত রাখেন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে- হিংসা, অহঙ্কার ও নাজায়েজ স্বার্থ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে। সৎ চরিত্র ও সৎ ব্যবহার হলো ইসলামের ভিত্তি। আদব ও ভালবাসা হলো ইলমে তাসাউফের পূর্বশর্ত। হযরত দাদা হুযুর মোজাদ্দেদে জামান হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহঃ) এবং হযরত ন’হুজুর কেবলা (রহঃ)-এর পথ নিসৃত দ্বীনি খেদমতের ক্রমধারার উত্তোরনে ন’হুজুরের একমাত্র বর্তমান সাহেবজাদা সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপি ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহন করেন। সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক ইসলাম প্রয়োগ ও আহলে সুন্নাত জামাতের সত্যিকার আদর্শ ও নীতি ভিত্তিক শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর জন্যে ১৯৯৭ ইং সালে পাবনা সদরে সমাজকল্যানমূলক প্রতিষ্ঠান মোজাদ্দেদীয়া সায়াদাত মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ মিশন বাংলার জমিনে অসংখ্য ভূমিকা রাখে।

Copyright © www.furfurasharif.com ,২০১০, সর্ব্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত
এই ওয়েব সাইটের যে কোন তথ্যের বা অংশের কর্তৃপক্ষের বিনা আনুমতিতে অন্যত্র প্রকাশ, ব্যবহার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন আইনতঃ নিষিদ্ধ।

Tags: Furfura Sharif, Furfura, Furfura Darbar Sharif, Hazrat Abu Bakr Siddique, Hazrat Abu Bakar Siddique, Sharif, Islam, Sufi, Ahle Sunnat, Mazaar Sharif, Noa Huzur, Nawa Huzur, Official Website Of Furfura Sharif, Tasawwuf, Spirituality, Najmus Saadat Siddique

নায়েবে মুজাদ্দেদ পীরে কামেল