তাসাওফ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম


কোরআন শারিফের দুই প্রকার আর্থ

কোরআন শারীফের সুরা নহলে আল্লাহ তাআলা বলেছেন
“আমি তোমার উপআর কোরআন নাজিল করিয়াছি এই হেতু যে, তুমি তুমি লোককে প্রকাশ করিবে যাহা তাহাদের উপর নাজিল করা হইয়াছে এবং এই হেতু যে, তাহারা চিন্তা করিবে।”
তফসির বয়জবি,৪৪৬ পৃঃ– আল্লাতায়ালা বলিতেছেন যে, হজরত মোহাম্মদ (ছাঃ) কোরআনের আদেশ, নিষেধ বা অস্পষ্ট বিষয়গুলি প্রকাশ করিবেন এবং লোকে উহার প্রকৃত মর্ম্ম অবগতির জন্য চিন্তা করিবেন। হজরত কতক স্হলে স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করিয়াছেন, অবশিষ্ট স্হলে কেয়াস ও জ্ঞান দ্বারা মর্ম্ম অবগতির জন্য উপদেশ দিয়াছেন।
তাফসির কবির, ৫ম খণ্ড—
কোরআনের কতকাংশের মর্ম্ম অস্পষ্ট, সেই হেতু হজরত নবী করিম (সাঃ) উহার মর্ম্ম প্রকাশ করিয়া দিতে আদিষ্ট হইয়াছিলেন। ইহাতে প্রমানিত হইল যে, কোরআন শারিফের আয়াতের স্পষ্ট দুই প্রকার মর্ম্ম আছে। যদি উহা না থাকিত, তবে হজরত নবী কারিম (সাঃ) কেন উহা প্রকাশ করিতে এবং কেন লোকে কেয়াছ বা জ্ঞান দ্বারা উহা আবিষ্কার করিতে আদিষ্ট হইলেন?
কোরআন, সুরা ত্বাহা— “রাব্বি যিদনি ইলমা”
“হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমার এলম বেশী কর।”
তাফসির মনির, দ্বিতীয় খণ্ড, ২৮ পৃষ্ঠা–
আল্লাতায়ালা বলিতেছেন, হে মোহাম্মদ (সাঃ), আপনি কোরআন শারিফের নিগূঢ় মর্ম্মসমূহ বুঝিতে সক্ষম হইবার জন্য আমার নিকট প্রার্থনা করূন, কেননা উহা অসীম।
মেশকাত, ৩৫ পৃষ্ঠা—
হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলিয়াছেন, কোরআন শারিফ সপ্ত অক্ষরে (কেরাতে) অবতীর্ণ হইয়াছে। প্রত্যেক আয়াতের দুই প্রকার আর্থ আছে, স্পষ্ট ও অস্পষ্ট। প্রত্যেকের এক একটি সীমা (হদ) ও বুঝিবার স্হল আছে।
ইমাম বাগাবি এই হাদিসটি ‘শরহোছ সুন্নআহ’ গ্রন্হে বর্ণনা করিয়াছেন।
আল্লামা তিবি মেশকাতের ঢীকায় লিখিয়াছেন—
সৈয়দ জামালুদ্দিন বলিয়াছেন, হজরত নবী করিম (সাঃ) প্রত্যেক অক্ষরকে একবার জাহিরি ও বাতিনী দুই ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন। দ্বিতীয়বার প্রত্যেকের হদ ও এত্তেলাস্হান নির্দ্ধারণ করিয়াছেন। হজরত নবী করিম (সাঃ) ও সাহাবাগণ কর্ত্তৃক যে তাফসির বর্ণিত হইয়াছে, উহাকে জাহর বলে। আর সূক্ষ্ম জ্ঞান দ্বারা যে নিগূঢ়ত্ত্ব অবগত হইয়া যায়, উহাকে বাতন বলে। হদ ও এত্তেলাস্হলের সীমা নাই, কেননা উভয়ের শেষ সীমা মারেফাত-তত্ত্বজ্ঞ পীরদের পথ। আল্লাতআলা এবং তাঁহার মানোনীত নবীগণ ও অলিউল্লাগনের মধ্যে নিহিত তত্ত্বজ্ঞান আরবী ব্যাকরণ ও ওভিধান শিক্ষা করিলে এবং উহাতে পারদর্শিতা লাভ করিলে এবং জাহেরি মর্ম্ম যদ্দ্বারা জানা যায়, তাহার হাদিস ও সাহাবাগণের মতের অনুসরণ করিলে, উহার জাহের মর্ম্ম অবগত হওয়া যায় এবং কঠোর সাধ্য সাধনা দ্বারা আত্মশুদ্ধি করিটে পারিলে, উহার বাতিনী মর্ম্ম অবগত হওয়া যায়।
তাফসিরে মায়ালেমে বর্ণিত আছে, কোরআন শারিফের শব্দকে(শব্দার্থকে) ‘জাহর’ বলে এবং নিগূঢ় তত্ত্বজ্ঞানকে ‘বাতন’ বলে। উহার বুঝিবার শাক্তিকে ‘মাতলা’ বলে। খোদাতায়ালা গবেষোণাকারীদের উপর এরুপ নিগূঢ় তত্ত্বজ্ঞান প্রকাশ করেন–যাহা অন্য কাহারও উপর প্রকাশ করেন না।
ইমাম রাজি তফসির কবিরের তৃতীয় খণ্ডে (১২২ পৃষ্ঠায়) লিখিয়াছেন—
সূক্ষ্মতত্ত্বজ্ঞ ঢীকাকার প্রত্যেক আয়াতে বহু আশ্চর্য্যজনক গুপ্ত ভেদ ও সূক্ষ্মতত্ত্বজ্ঞান অবগত হইয়া থাকেন।
আরও তিনি উক্ত তফসিরের নবম খণ্ডে (২৪০ প্রষ্ঠায়) লিখিয়াছিলেন—
যে খোদার প্রত্যেক কথায় এক একটি গুপ্ত ভেদ নিহিত আছে, আমি তাহার পবিত্রতা প্রকাশ করিতেছি। এই আয়তে এইরুপ মর্ম্ম লিখিট হইল, কিন্তু এখনও উক্ত আয়তে অধোদেশে বহু অব্যক্ত তত্ত্বজ্ঞান নিহিত আছে। যদি জমির সমস্ত বৃক্ষ লেখনী হয় এবং ক্রমান্বয়ে সপ্ত সমুদ্রের পানি মসীরুপে ব্যবহৃত হয় তবু ও খোদাতায়ালার বাক্য সকল শেষ হইবে না।
আকায়েদ নাসাফি, ১১৯/১২০ পৃষ্ঠা–
কোরআনের আয়ত ও হাদিস সকলের স্পষ্ট ও প্রকাশ্য মর্ম্ম গ্রহণীয় হইবে, অবশ্য কতক স্হলে অকাট্য দলীল অনোযায়ী অস্পষ্ট মর্ম্ম গ্রাহ্য হইবে। কাফের বাতিনিয়া দল যেরুপ স্পষ্ট মর্ম্ম ত্যাগ করিয়া যে যে মর্ম্মের দাবী করে, উহা কাফেরী কার্য্য। কটক বিচক্ষণ বিদ্বানের মট এই যে, কোরআনের আয়াত ও হাদিস সমূহের স্পষ্ট মর্ম্মই গ্রহনীয় হইবে, তবে তৎসমূদয়ের এইরুপ সূক্ষ্ম তত্ত্বজ্ঞানের অস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে– যাহা তরিকাপন্হী পীরগণের উপর প্রকাশ হইয়া থাকে, কিন্তু উক্ত তত্ত্বজ্ঞান গ্রহণ স্পষ্ট মর্ম্মের বিপরীত নহে। তাঁহাদের এই মতকে পূর্ণ ইমান ও বিশুদ্ধ মা’রেফাত বুঝিতে হইবে।
আল্লামা জামি ‘নাফহাতোল উনচস’ কেতাবে লিখিয়াছেন, প্রকৃত কামেল ও সালেক আট শ্রেণী। আর সাত শ্রেনী লোক কামেল ও সালেক নহেন, কিন্তু তাঁহাদের তুল্য হইবার চেষ্টা করেন। আর সাত শ্রেণীর লোক কামেল ওসালেক হইবার দাবী করে, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তাহারা কতক কাফের ও কতক রিয়াকার ফাসেক। ইহাদের মধ্যে একদল বাতিনিয়া ও মবাহিয়া নামে অভিহিত হইয়া থাকে, তাহারাই কোরআন অ হাদিসের স্পষ্ট মর্ম্মসমূহ অস্বীকার করে। তাহারা শারিয়ত অমান্য করতঃ কাফের হইয়াছে।
ইমাম গাজ্জালি ‘এহইয়াওল-উলুম’ কেতাবে উক্ত বাতিনিয়া দলের প্রতিবাদ করিয়াছেন। আওয়ারেফ কেতাবে বর্নিত আছে, পীর জোনাএদ বাগদাদী (রঃ) বলিয়াছেন যে, আমাদের এই তারিকতের ভিত্তি কোরআন ও হাদিস দ্বারা দৃঢ় করা হইয়াছে। ইমাম আহমদ সারহান্দি (রঃ) মাকতুবাতে লিখিয়াছেন, তরিকত শারিয়ত ভিন্ন আর কিছুই নহে। তরিকতের আদি আবিষ্কারক হজরত নবী করীম (সঃ),  সাহাবা, তাবিয়ি ও তাবা-তাবিহি ছিলেন। হজরত সালমান ফার্সি (রাঃ), ইমাম হাসান বাসারি (রাঃ), ইমাম জাফর সাদেক (রাঃ), ইমাম মোহাম্মদ বাকের (রাঃ), ইমাম মুসা কাজেম (রাঃ), ইমাম আলি রেযা (রাঃ), পীর মা’রুফ কারখি (রাঃ), পীর সার্রি সাকতি (রাঃ),পীর জোনায়েদ বাগদাদি (রাঃ),পীর শেখ শিবলী (রাঃ), হজরত সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানী (রাঃ), পীর শেখ ফরিদদ্দিন (রাঃ), হজরত খাজা মঈনদ্দিন চিশতি (রাঃ), হজরত খাজা নিজামদ্দিন (রাঃ), খাজা বাহাউদ্দিন (রাঃ) প্রভৃতি এইরুপ সহস্রাধিক পীর তরিকতপন্হী ছিলেন। তাহারা শারিয়ত অমান্ন্য করেন নাই তাঁহারা কোরআন ও হাদিসের স্পষ্ট মর্ম অস্বীকার করেন নাই।

শরিয়, তরিকত, হাকিকত ও মা’রেফাতের অর্থ

ফাতাওয়ায় আজিজি, ১ম খণ্ড, ১৫৫/১৫৬ পৃষ্টা—
‘শারিয়ত’ শব্দের দুই প্রকার আর্থ আছে, একতি আ’ম(সাধারাণ) আর একটি খাস(বিশিষ্ট)। সাধারাণ অর্থ এই যে, হজরত নবী করিম (সাঃ) দ্বীন সংক্রান্ত যে যে বিশ্বাস; ক্রিয়া-কলাপ, স্বভাব, চরিত্র, নিয়ত, এবাদত, সুন্নত, মোস্তাহাব, মোবাহ, ফরজ-ওয়াজেব আদেশ ও নিষেধ প্রকাশ করিয়াছেন, তাহাকে শারিয়ত বলে। বিশিষ্ট অর্থ এই যে, সমস্ত এবাদত দাহ্য অবয়ব বা অর্থের দ্বারা সম্পাদিত হয়, তাহাকে শারিয়ত বলে। ইহা বর্ণনা করা ফাকিহ আলেমদের কর্ত্তব্য কার্য্য এবং ইহা ফেকহের কেতাবে বর্ণিত হইয়াছে।
প্রক্ষান্তরে তরিকত, হাকিকত ও মা’রেফাতের কার্য্যও আছে। (অহঙ্কার, দ্বিষ, হিংসা, আত্মগরিমা, রিয়া(লক দেখাইবার উদ্দেশ্যে এবাদত করা), ক্রোধ, কৃপণতা ইত্যাদি), চরিত্র ও মনোভাবগুলি দূরিভূত করা এবং কাতর, বিনম্র ও ভীতভাবে একগ্র-চিত্তে স্রর্ব্বাঙ্গ সুন্দর এবাদত করাকে ‘তরিকত’ বলে।
‘এখলাস’(শুদ্ধ সঙ্কল্প), ‘আএনোল ইয়াকিন’(প্রত্যেক বস্তু স্বচক্ষে দর্শ্ন করিয়া অটল বিশ্বাস অর্জ্জন করা), ‘মোশাহাদা’ অদৃশ্য বিষয়গুলির দর্শন লাভ করা এবং উক্ত তত্ত্বজ্ঞান দর্শনে আত্ম-বিস্মৃতিকে ‘হকিকত’ বলে।
খোদাতাআলার একত্ত্ব, সহকৃত, নিকটবর্ত্তি ও বন্ধু হওয়ার তত্ত্বজ্ঞান এবং বেলায়াত ও আওলিয়ার দরজা ইত্যাদি আকিদা সংক্রান্ত গুপ্ত তত্ত্বগুলি অবগত হওয়াক্র ‘মা’রেফাত’ বলে।
এই ‘তরিকত’, ‘হকিকত’ ও ‘মা’রেফাত’ শরিয়তের অন্তর্ভূক্ত অবশ্য প্রত্যেক এলমের পারদর্শী বিদ্বানগণ তৎসংক্রান্ত অস্পষ্ট মসলা সমূহকে এজতেহাদ দ্বারা আবিষ্কার করিয়া স্পষ্ট মসলাগুলির সহিত লিপিবদ্ধ করিয়াছেন এবং তৎসমুদয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিবরণে প্রমানিত হইল যে, তরিকত, হকিকত অ মা’রেফাত শারিয়তের অন্তর্গত এবং কোরআন হাদিস হইতে আবিস্কৃত হইয়াছে।

মোজাদ্দেদে যামান হজরত আবু বকর সিদ্দীক রাহঃ এর খালিফা হজরত আল্লামা মোহঃ রুহুল আমিন রাহঃ কতৃক রচিত “তাছাওয়ফ তত্ত্ব বা তরিকত দর্পণ (মলফুজাতে-সিদ্দিকীয়া)” হইতে গৃহীত