আশেকে রসুল সুলতানুল ওয়ায়েজিন জুলফিক্কার আলী সিদ্দিকী (ছোট হুজুর কেবলা) (রহঃ)

সোমবার, ডিসেম্বর ২০, ২০১০

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

উনবিংশ শতাব্দী মুসলিম ভারতের ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়কে ঝলমলিয়ে রেখে ছিলেন যে সব ক্ষণজন্মা পুরুষ, তাঁদের অন্যতম প্রধান ছিলেন মুজাদ্দেদে জামান, আমিরুশ শরিয়ত, কুতুবুল আলম সুলতানুল আরেফিন, গওসে-সামদানী, মাহবুবে সোবাহানী, আলেমে হাক্কানী, হযরত শাহ সূফী মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিকী  ফুরফুরাভী (রঃ)- এর সর্বকনিষ্ঠ সাহেবজাদা আশেকে রাসুল, হাদিয়ে মিল্লাত, মাহবুবে সোবাহানী আলা হযরত শাহ সুফী পীর মোহাম্মদ জুলফিক্কার আলী সিদ্দিকী আল-কোরায়সী অনুমান বাংলা ১৩২৬ সন মোতাবেক ইং ১৯২০সাল এবং হিজরী ১৩৪০সালে ফুরফুরা শরীফে জন্ম গ্রহণ করেন।

এলমে জাহের ও এলমে বাতেনের খনি মুজাদ্দেদে জামান (রঃ) বিখ্যাত আলেমে দ্বীনদের তত্ত্বাবধানে ছোট হুজুর পীর কেবলাকে দ্বীনি তালীমের ব্যবস’া করেন। মিয়া সাহেব মহল্লার মাদানী মসজিদে  শিক্ষা নিতেন। ছোট বেলায় তিনি খুবই চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন। ফলে পড়াশুনায়  তাঁর গভীর মনযোগ ছিল না। এ দেখে তাঁর আম্মাজান খুবই চিন্তা করতেন এবং তাঁর পিতা মুজাদ্দেদে জামান (রঃ) দোয়া করতেন। এক সময়ে তিনি নিজের অনাগত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে খুব কাঁদিতে থাকেন। তাঁর আম্মাজান বিচলিত হয়ে দাদা হুজুর মুজাদ্দেদে জামান (রহঃ)  এর খেদমতে অত্যন- বিনীত ভাবে আরজু করেন। দাদা হুজুর কেবলা তাঁকে সান-না দিয়ে বলেন-“ বাবা তুমি দরবেশিতে মগ্ন থাক, আল্লাহ তোমার দরজায় পাল্কী বাঁধা রাখবেন।”

ছোট হুজুর কেবলার বাস-ব জীবন দাদা হুজুর মুজাদ্দেদে জামান (রঃ) এর দোয়ার পরিপূর্ণ ফল স্বরূপ।

ছোটবেলায় শিশুসুলভ চপলতার প্রভাবে তাঁর জীবনের বেশ কয়েকটি বছর কেটে যায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনিও তা বুঝতে পারেন। নিজেকে পড়ার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠেন। তাঁর জবানী শুনেছি, তিনি বলতেন- ‘আব্বাজান কেবলা আমার জন্য তালীমের ব্যবস্হা করেন। আমি মাদানী মসজিদে পড়তাম, কখনও কখনও শুয়ে থাকতাম।’ পড়াশুনা ব্যাপারে পূর্বের সব ধ্যান ধারণা পরিবর্তন করে মনোযোগ সহকারে তিনি  তালীম পেতে থাকেন এবং দিন দিন উন্নতি করতে থাকেন। ঠিক এমনি সময়ে পিতৃহারা হয়ে পড়েন তিনি। ফলে পড়াশুনায় আবারও ব্যাঘাত ঘটে। কিন’ ততদিনে নিজেকে মেলে ধরার মত যোগ্যতা আল্লাহপাক তাঁকে দান করেছেন। বিজ্ঞ আলেম দ্বীনের মাধ্যমে এলমে জাহেরী ও আধ্যাত্মিক তত্ত্ববিদদের মুকুটমণি মুজাদ্দেদে জামান কুতবুল আলম দাদা হুজুর পীর কেবলা থেকে বাতেনী তালীম পেয়ে অল্পদিনেই যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেন। আল্লাহ পাক তাঁকে এমন নেয়ামত দান করেন যে তা সাধারণের জ্ঞানের বাহিরে। পরবর্তীকালে তাঁর ওয়াজ এবং আলোচনা শুনে কঠোর সমালোচকেরাও তা অকপটে স্বীকার করতেন। ডিগ্রি ডিপ্লোমা নেই বলে যারা তাঁর সমালোচনা করেছেন, পরবর্তীকালে তারাই তাঁর জ্ঞানের গভীরতা দেখে ভুয়সী প্রশংসা করেছেন অকপটে। এ সবই জামানার মুজাদ্দেদ সাহেবের দোয়া একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তাক্‌ওয়া ও পরহেজগারী

সুন্নতে নবাবীর পূর্ণ পাবন্দ ছিলেন ছোট হুজুর কেবলা (রঃ)। সার্থক নায়েবে-নবী। বিশ্ব-নবীর প্রেম ও ভালবাসা, মহব্বত ও অনুপম আদর্শ মহৎ জীবন সম্বন্ধে ওয়াজ নসিহতে অধিকাংশ সময় বিশদ আলোচনা করতেন। তাঁর নিজস্ব বর্ণনাভঙ্গীর মহিমায় তা অত্যন- হূদয়গ্রাহী হয়ে উঠতো। আশেকে রাসুল, ছোট হুজুর পীর কেবলার নবী জীবনের মনোজ্ঞ ওয়াজ পাষাণ হূদয় উদ্বেলিত হয়ে উঠতো। তখন উপসিহত মানুষেরা অশ্রুজলে বুক ভাসিয়ে কাটা কবুতরের ন্যায় ছটফট করতো।

মউত ও কবর সম্বন্ধে এমন মর্মস্পর্শী নসিহত করতেন যে, তাঁর জবানের তাছিরে ধর্মবিমুখ গর্হিত ব্যক্তিরাও নতুন জীবন ফিরে পেত। তাইতো পাপী-তাপী মানুষেরা আশায় বুক বেধেঁ তাঁর সভায় পতঙ্গের মত দলে দলে ছুটে আসতো।

ছোট হুজুর পীর কেবলা (রহঃ) অত্যান- নিষ্ঠার সাথে তাকওয়া ও পরহেজগারী অবলম্বন করতেন। তার একটি মাত্র উদাহরণ- পাসপোর্ট প্রথা চালু হওয়ার সাথে সাথে তিনি পূর্ব-বাংলায় যাওয়া বন্ধ করেন। কেননা পাসপোর্ট করতে হলে ফটো তুলতে হবে। ফরজ কাজের জন্য ফটো তোলা নিয়ে আলেমদের মতভেদ দেখা যায়। ফুরফুরা শরীফের অন্যান্য হুজুর কেবলাগণ নফল কাজের জন্য ফটো তোলা জায়েজ ধারনা করলেও ছোট হুজুর কেবলা তাকওয়ার জন্য ফটো তুলে পাসপোর্ট করে পূর্ব-বাংলায় (অধুনা বাংলাদেশ)  যাননি। হাজার হাজার ভক্ত মুরীদানের বহুবার বিনীত অনুরোধ সত্বেও তিনি তা করতে অপারগতা জানিয়েছেন। ছোট হুজুর কেবলা ছিলেন আশেকে রাসুল, নবীপ্রেমের পাগল। প্রতি বছর হজ্বে যাওয়ার সামর্থ থাকা সত্বেও একবারের বেশী হজ্ব করেন নি। জীবনে একবার হজ্ব ফরজ। সে উদ্দেশ্যে ফটো তুলে পাসপোর্ট করা জায়েজ। একাধিকবার হজ্জ করা নফল। নফল হজ্বের জন্যও ফটো তোলা তিনি জায়েজ মনে করতেন না।

শেষ সফর

সুলতানুল ওয়ায়েজিন, আশেকে রাসুল, মোজাহেদে ইসলাম, মাহবুবে সোবাহানী, অলিয়ে কামেল, হযরত মাওলানা শাহসুফী জুলফিকার আলী সিদ্দিকী (রঃ)  ২২শে আশ্বিন ১৩৯২, ২০শে মহরম ১৪০৫ হিজরী, ৮ই অক্টোবর ১৯৮৫ ইংরেজী মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টা ৫৫ মিনিটে ফুরফুরা শরীফের নিজ্ব বাসভবনে ইনে-কাল করেন। ইন্ন লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।



Copyright © www.furfurasharif.com ,২০১০, সর্ব্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত
এই ওয়েব সাইটের যে কোন তথ্যের বা অংশের কর্তৃপক্ষের বিনা আনুমতিতে অন্যত্র প্রকাশ, ব্যাবহার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন আইনতঃ নিষিদ্ধ।