ক্বাইয়ূমে যামান মাওলানা হযরত আবদুল হাই সিদ্দিকী (বড় হুজুর কেবলা) (রঃ)

সোমবার, ডিসেম্বর ২০, ২০১০

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

মোজাদ্দেদে-জামান, পীর কেবলা বিবাহিত জীবনে দীর্ঘদিন পুত্রসন্তান হতে বঞ্চিত ছিলেন। অতঃপর তিনি বাংলা ১৩০৯ সালে পবিত্র হজ্বে যান। সে সময়ে তিনি কাবাশরীফের ‘গেলাফ’ ধরে নেকসন্তানের বাসনায় দরবারে এলাহিতে ব্যাকুল হয়ে কামনা করেন। হজ্বের পরের বছর অর্থাৎ দাদা হুজুর মোজাদ্দেদ-জামান (রঃ)-র প্রায় ৪৫ বছর বয়সে পুত্র সন্তান ক্বাইয়ূমে যামান মাওলানা হযরত আবদুল হাই সিদ্দিকী সাহেব জন্মগ্রহণ করেন। তিনি “বড় হুজুর” নামে বিখ্যাত।

বাল্যকাল হতেই বড় হুজুর পীর কেবলা অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী ছিলেন। তিনি প্রথমে স্বগৃহে যশোরের মাওলানা আবদুল গফুর সাহেব ও নোয়াখালির মাওলানা হাফিজুল্লাহ সাহেবদ্বয়ের নিকট এলেমদীন হাসিল করেন। অতঃপর তিনি পেশোয়ারের মাওলানা আবদুল মজিদ সাহেবের কাছে তফসির এবং ২৪ পরগণার মাওলানা সরওয়ার সাহেবের নিকট ‘ফেকাহ্‌’, ’অসুলে-ফেকাহ্‌’ প্রভৃতি বিষয় তালীম নেন।

ইতিমধ্যে মোজাদ্দেদে-জামান তাঁকে ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলিকাতা মাদ্রাসা -এ- আলীয়া’য় উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্হা করেন। তিনি যথেষ্ট কৃতিত্বের সাথে মাদ্রাসা আলীয়ায় অধ্যায়ন করেন।তাঁর কণ্ঠস্বর অত্যন- সুমিষ্ট, তিনি যখন সুমধুর কণ্ঠে শেষ আশরার পড়তেন, তখন নীরব-নিস-ব্ধে মানুষ শ্রবণ করতেন। ছাত্রজীবন থেকে তাঁর আদব-আখলাক ছিল উন্নত আদর্শের, ফলে ওস্তাদ ও ছাত্রমহলে প্রিয়জন রূপে পরিচিত লাভ করেন।

২০ বছর বয়সে বাংলা ১৩৩০ সালে স্বীয় পিতা ও পীর মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) বড় হুজুরকে নিয়ে কাবার মালীকের দরবারে দোয়া-শোকরীয়া জ্ঞাপন করেন, এবং বিশেষ অনুমতিক্রমে কতিপয় বিশিষ্ট খলিফা ও বড় হুজুর কেবলাসহ হযরত নবী (সঃ) এর রওজা শরীফ মসজিদে নবাবী’তে সারা রাত মোরাকাবা মোশাহেদা ও জিকের আজকার করেন। মোজাদ্দেদে-জামান, নবীপাকের রওজা শরীফে একরাত ও একদিন সামনে বসিয়ে বড় হুজুরকে এলমে-লাদুন্নির ফয়েজ প্রদান করেন।

বড় হুজুর কেবলা মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) এর সান্নিধ্যে থেকে ছিয়াহ্‌সেত্তাহ, ফেকাহ ও অন্যান্য ধর্মগ্রন’ অধ্যায়নে গভীর জ্ঞানার্জন করেন। অতঃপর তিনি স্বীয় পীর ও মোর্শেদ মোজাদ্দেদে-জামান পীর কেবলার খেদমতে থেকে এলমে বাতেনী তালীম পেতে থাকেন’ এবং তাঁর সঙ্গে সাথে সমগ্র বঙ্গ-আসাম ব্যাপী এশায়াতে ইসলামের খেদমতে আত্ননিয়োগ করেন। বাংলা ১৩৩০ সাল থেকে ১৩৪৫ সাল পর্যন- প্রায় ১৫ বছর কঠিন মেহনত ও রেয়াজত করে মোজাদ্দেদে-জামান, কোতবুল-আলম পীর কেবলার খেদমতে এলমে তাসাউফ তালীম গ্রহণ করে কামালিয়াত ও খেলাফত হাসিল করেন।

সে সময় এশায়াতে ইসলাম তথা সভা সমিতি ও মাহফিলে ওয়াজ  নসিহতের রাস্তা অত্যন্ত দুর্গম ছিল। মহৎ অথচ কঠিন ব্রত নিয়ে, আয়াস-আরাম পরিত্যাগ করে পিতার মহান শিক্ষায় জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। তিনি মোজাদ্দেদে-জামান পীর কেবলার জীবদ্দশায় অনেক কাজে তাঁকে সহায়তা করতেন, এমনকি মুরিদদেরকে বাতেনী তালীম দিতেন, অনেক সময় তাঁর অনুমতিক্রমে বায়য়াতও করতেন। তিনি মহান পিতার দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটি পর্যন- এশায়াতের রাহে ত্যাগ করে গেছেন।

মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) বড় হুজুর কেবলাকে ‘ইত্তেহাদি’ ফয়েজ প্রদান করেন। ফলে তিনি বে-খেয়াল, বে-তাব দেওয়ানা হন। অনেকদিন তিনি দেওয়ানা মাস্তানের ন্যায় বিচরণ করতেন। এমনকি পনাহারের প্রতিও তাঁর খেয়াল থাকত না। প্রসঙ্গতঃ বড় হুজুর পীর কেবলা বলেন,- “আমার মাস্তী  হালাত দেখে আম্মাজান খুব পেরেশান হয়ে পড়তেন। তিনি আমাকে ধরে ধরে ভাত খাওয়াতেন, কখনও দু’চার লোকমা খেতাম, কখনও মুখের লোকমা ফেলে দিয়ে পালিয়ে যেতাম। আমার মাস্তী হালাত দেখে ওয়ালেদ পীর কেবলা আম্মাজানকে বলেন- ‘হ্যাগো ! ছেলেটির উপর জোর ইত্তেহাদি ফয়েজ পড়ে গেল; ওর দিকে একটু খেয়াল রেখ।”

হযরত মাওলানা তাওয়াকল আলী (নদীয়া) সাহেবের মুখে শুনা গিয়াছে- ‘মোজাদ্দেদে-জামান, পীর কেবলার ইনে-কালের খবর পেয়ে বসিরহাটের আল্লামা পীর রুহল আমীন সাহেবের সফর থেকে ঘরে ফিরে আসেন, এবং কলিকাতায় টিকাটুলি মসজিদে বড় হুজুরের হাতে কাজদিদে বায়য়ত হন।’

বাস-ব জীবন

বড় হুজুর কেবলা মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) এর আবদ্ধ কাজ ত্বরান্বিত ভাবে সম্পন্ন করার সংকল্পে ঝাপিয়ে পড়েন। মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) কর্তৃক বাংলা আসামের হাজারো দ্বীন-বৃক্ষ’ অত্যন- কর্তব্য-নিষ্ঠায় সযত্নে আজ মহীরূপে ধারণ করে ফলে ফুলে পরিশোভিত যে সিলসিলার উদ্দ্যোগে তাঁর আন্যতম পুরধা ছিলেন ’বড় হুজুর’ পীর কেবল (রঃ)। তার অক্লান- পরিশ্রমের ফসল আজ উভয় বঙ্গ ও আসামের আপামর জনসাধারণের কল্যাণে নিয়োজিত।

তিনি ১৯৪৮ সালের ৮ই মার্চ চিরধন্য ফুরফুরা শরীফের ঐতিহাসিক ’মাহফিলে ওয়াজ দর-জেমানে আঁ ঈসালে সওয়াবের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ’জমিয়তে ওলামায়ে হানাফিয়ার’ প্রতিনিধি সমন্বয়ে  ’হেজবুল্লাহ কমিটি’ (আল্লাহ ওয়ালার দল) নামে সংস’া কায়েম করেন। রাজনীতি বিবর্জিত জনকল্যণমূলক সংস’ায় শিক্ষা-ধর্ম-সমাজনীতি বাস-বে সার্থক রুপায়ণে তিনি উন্নতমুখী আদর্শ কর্মসুচী সন্নিবেশিত করেন। উক্ত রেজিষ্ট্রিকৃত সংস’ার আজীবন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। বাংলার গ্রামে-গঞ্জে হেজবুল্লাহ্‌ কমিটি গঠিত হয়। শত শত মসজিদ খানকা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মসজিদ ভিত্তিক হেজবুল্লাহ কোরআনীয়া মাদ্রাসা কায়েম হয়। মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান সমূহ বৃহত্তর হয়ে উন্নতমানের সিনিয়র ও হাই মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে বড় হুজুর কেবলার মহৎ প্রচেষ্টায়।

ফুরফুরা  শরীফে মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) প্রতিষ্ঠিত ফতেহিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা আজ ফুরফুরা ফতেহিয়া টাইটেল মাদ্রাসা। ইতিপূর্বে একমাত্র কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা ব্যতীত গ্রাম-বাংলায় ’টাইটেল’ মাদ্রাসা ছিল না।

ফুরফুরা শরীফে মাওলানা আবু বকর মেমোরিয়াল ইউনিয়ন হেলথ সেন্টার, ডাকঘর, নিউস্কীম হাই মাদ্রাসা ও ছাত্রাবাস এর সার্বিক উন্নতির মূলে বড় হুজুর কেবলার দান অনস্বীকার্য। বড় হুজুর কেবলা নারী শিক্ষার অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে খাতুনের বিখ্যাত এল, মল্লিক সাহেবদের বদান্যতায় ফুরফুরা শরীফ থেকে অনতিদূর চকতাজপুরে ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সিদ্দিকীয়া গার্ল হাই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। দোঁকের মাদ্রাসা ও মসজিদ বড় হুজুর কেবলার একক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত।

তিনি মর্মে মর্মে অনুধাবন করেছিলেন যে- জাতির সার্বিক উন্নতির মূলে প্রেস, প্লাটফর্‌ম অপরিহার্য । তিনি এককালের ’পলাশী’ নামক সাপ্তাহিক পত্রিকার সত্ব খরিদ করে সমাজে প্রকাশ করেন। ফানাফিশ্‌ শায়েখ বড় হুজুর কেবলা মুজাদ্দেদে জামান কেবলার স্মরনে ১৯৪১ সালে ’নেদায়ে ইসলাম’ ধর্মীয় মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন।

বড় হুজুর কেবলার স্বভাব চরিত্র ও তাকওয়া

বড় হুজুর পীর কেবলা (রঃ) বাল্যকাল হতে অত্যন- ধর্মপ্রাণ, চরিত্রবান, বিনয়ী ছিলেন। সবার সাথেই তিনি প্রাণ খুলে কথা বলতেন। তারঁ সাথে আলাপ করলে মানুষ মুগ্ধ না হয়ে পারতেন না। তিনি প্রায়ই বলতেন ভালবাসা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা অস্ত্র যা দ্বারা বনের বাঘকেও বশীভুত করা যায়। তিনি খুব সাধারন জীবন যাপন করতেন। ফজুল খরচ করতেন না।

তাকওয়া ও পরহেজগারী ছিল তার জীবনের মূল পাথেয়। তাই আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন। তার সান্নিধ্যে লোকেরা আসত হাসতে হাসতে আর চলে যেত অশ্রুসজল নয়নে।

মাদ্রাসা স্হাপন:

বড় হুজুর কেবলা (রঃ) মানুষকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার অভিপ্রায়ে দেশব্যাপী বহু মাদ্রাসা স্হাপন করেছেন। এর মধ্যে উল্লাসী সিনিয়র মাদ্রাসা, উলুবেড়িয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, দোগেছিয়া মাদ্রাসা, সিদ্দিকিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, আইট সিদ্দিকিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, নারায়নপুর মাদ্রাসা উল্লেখযোগ্য।

শেষ সফর:

বড় হুজুর কেবলা (রঃ) ১৯৭৭ সালের ১৩ই মে শুক্রবার রাত ১০টা ৫০মিনিটে ইনে-কাল করেন। ১৫ই মে রবিবার বাদ জোহর জানাজা নামাজ শেষে তাকে মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) এর ডান পাশে দাফন করা হয়। ইনে-কালের সময় তিনি স্ত্রী, ৪ পুত্র ও ১ কন্যা রেখে যান।


Copyright © www.furfurasharif.com ,২০১০, সর্ব্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত
এই ওয়েব সাইটের যে কোন তথ্যের বা অংশের কর্তৃপক্ষের বিনা আনুমতিতে অন্যত্র প্রকাশ, ব্যাবহার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন আইনতঃ নিষিদ্ধ।