মুজাহিদে মিল্লাত আব্দুল কাদের সিদ্দিকী (সেজলা হুজুর কেবলা)(রঃ)

সোমবার, ডিসেম্বর ২০, ২০১০

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

মুজাহিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা শাহ সুফী পীর মোহাম্মদ আব্দুল কাদের সিদ্দিকী সেজলা হুজুর (রঃ) মোজাদ্দেদে-জামান দাদা হুজুর পীর কেবলা (রঃ)-এর ৩য় সাহেবজাদা। তিনি অনুমান বাংলা ১৩১৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি কোলকাতার তৎকালীন নামকরা দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ‘মাদ্রাসা রমজানীয়া’ থেকে অত্যন্ত- কৃত্বিতের সাথে ফারেগ হন। অতঃপর তিনি মোজাদ্দেদে-জামান, পীর কেবলা (রঃ) এর খেদমতে থেকে তালীম তাওয়াজ্জোহ পেতে থাকেন এবং খেলাফত ও কামালিয়াত হাসিল করেন। মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) এর সাথে সফরে সর্বদা থাকতেন। তিনি জাহেরী ও বাতেনীতে মজবুত এবং খুব তেজস্বী আলেম ও বক্তা ছিলেন। রাজনীতিতে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল।

তিনি ‘জমিয়তে ওলামা বাংলা ও আসামের সেক্রেটারী রূপে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। পত্র-পত্রিকায় সুন্দর প্রবন্ধ লিখতেন। রাজনৈতিক পটভূমিকায় সমাজে তাঁর মতামতের যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। এমনকি জটিল সমস্যা সমাধানে তাঁর মতমতের প্রতি সমাজ তাকিয়ে থাকত।

তিনি মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) এর ২য় বাড়ী সীতাপুরে অবস্থান করতেন। ফানাফিশ্‌ শায়েখ সেজলা হুজুর পীর কেবলা (রঃ) মোজাদ্দেদে-জামান দাদা হুজুর কেবলা (রঃ) এর খেদমতে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। এমনকি, নতুন বিয়ে করেও ঘর সংসারে তাঁর আদৌ আগ্রহ ছিল না। এক সময় মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) সেজলা হুজুরকে সফর থেকে বাড়িতে কয়েকদিন থাকার জন্য পাঠিয়ে দেন।২/১ দিন যেতে না যেতেই তিনি আবার হুজুর কেবলার খেদমতে হাজির হয়ে যান।

দাদা হুজুর কেবলা একটু রাগ হয়ে বলেন-“তোমাকে না আমি বাড়ীতে থাকতে বলেছি, এত সত্বর এলে কেন? অশ্রুসজল নয়নে তিনি নিবেদন করেন- ’হুজুর আপনি যে আমার আব্বা ও পীর। আপনাকে না দেখে থাকতে পারি না।’ হুজুর সন’ষ্ট হয়ে আর কিছুই বলেননি।

তিনি জবরদসি- কাশফশক্তি সম্পন্ন অলি ছিলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে খুবই খ্যাতি অর্জন করেন। হযরত নবী পাক (সঃ) কে বহুবার স্বপ্নে দেখেছেন। দাদা হুজুর কেবলাকে তিনি কাশ্‌ফ হালতে অনেকবার দেখেছেন।

মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) সীতাপুর দরবার শরীফে ইং ১৯৩০ মতান-রে ৩১ সালে হযরত মনসুর বাগদাদী (রঃ) এর স্মরণে ঈসালে সওয়াব কায়েম করেন। পূর্বের ন্যায় যথারীতি ১২ও ১৩ই চৈত্র হয়ে আসছে। দাদা হুজুর ইনে-কালের পরের বছর দেখেন যে, রান্নাখানায় মোজাদ্দেদে-জামান (রঃ) তদারকি করছেন, তিনি-আব্বা বলে ডাকতে উদ্যত হতেই, দাদা হুজুর পীর কেবলা (রঃ) মুখে আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় চুপ করতে বলেন।

ছড়ি হাতে ওয়াজ করা তাঁর আদত ছিল, মিল্লাতের খেদমতে জীবন পাত করে গেছেন। তিনি দয়ালু ও কোমল হূদয়ের মানুষ ছিলেন। লোকজন সব সময়ে সাথে থাকত, তিনি তাদের সকলের সংসারের অভাব অভিযোগ দেখতেন; গরীব দুঃখীদের চেহারা দেখে তিনি তাদের ব্যাথা বেদনা, অভাব-অভিযোগ বুঝতে পেরে আপ্রাণ সাহায্য ও সহযোগীতা করতেন।

বাড়ীর সামনে বিরাট নবাবী মসজিদ, মসজিদের তুলনায় নামাজী কম, সে চিন্তায় তিনি বিভোর। জামা-কাপড়ের অসুবিধা জানতে পারলেই-লুঙ্গি, জামা, টুপি সব কিনে দিতেন, নামাজী বাড়ানো চাই; তিনি ঘোষণা করতেন- “কাজের অজুহাতে জুম্মার নামাজ পড়া যার অসুবিধা, তারা নামাজে আসলেই পুরা রোজের দাম পেয়ে যাবে। তোমরা মসজিদে এসে আমাকে চেহারা দেখিয়ে টাকা নিয়ে যাবে।” তিনি ছিলেন এমন দয়ালু।

জালালী মেজাজের অলি ছিলেন তিনি। একদিন সকালে জনাব মকবুল মিয়াকে সীতাপুর বাজারের জনৈক মিষ্টির দোকান থেকে গজা মিঠাই আনতে বলেন। বেচারা মকবুল মিয়া চৌকা গজা না এনে জিবে গজা কিনে আনেন। সেজলা হুজুর কেবলা বলেন যাও ফেরৎ দিয়ে চৌকা (চারকোনা) গজা নিয়ে এস। মকবুল মিয়া দোকানদারকে ফেরৎ নিতে বলায় দোকানদার বলেন- “ওতো ফেরৎ নোব না, ছুৎ হয়ে গেছে।”

তৎশ্রবনে তিনি আক্ষেপ করে বলতে থাকেন- হাঁ মানুষ, মানুষকে এত ঘৃণা করে, সৃষ্টির সেরা মানুষের এ চরম অপমান।” তখন তাঁর মধ্যে জালালীয়াত এসে গেছে, মিঠাইয়ের দোকানে চলে গেলেন, গজাগুলো মিঠাই দোকানদারের মুখের উপর নিক্ষেপ করে বলেন- “মানুষ আবার ছুৎ, যাও বাড়ীতে যেয়ে দেখ ছুৎ কাকে বলে।” দোকানদার খবর পেলেন যে, ধানের গাদায় আগুণ লেগেছে এবং একটি ছেলের পেশাব বন্ধ হয়ে গেছে। তখন দোকানদার দৌড়াদৌড়ি করে সেজলা হুজুর কেবলার খেদমতে এসে কাঁন্নাকাটি করে মাফ চাইতে থাকে। তিনি দোয়া করে বলেন- “যাও ছেলে সুস্হ্য হয়ে যাবে, কিন্তু ধানের গাদা শেষ হয়ে যাবে।” সত্যই তাই হলো, হাজার চেষ্টা করেও ধানের গাদার আগুন আয়ত্বে আনা সম্ভব ,হলো না।

দাদা হুজুর পীর কেবলার ইনে-কালে, তাঁর জানাজার বিশাল জমায়াত দেখে, কোন এক হালতে বলে ফেলেন-“তোমরা দেখো, আমার জানাজায় আরও বেশী লোক হবে।”

মাত্র ৩০/৩১ বছর বয়সে বসন- রোগে আক্রান- হয়ে সীতাপুরে বাংলা ১৩৪৭ সনের ২২শে ফাল্গুন বেলা ন’টায় (ফুরফুরা শরীফের ঈসালে সওয়াবের দ্বিতীয় দিন) ইনে-কাল করেন। তাঁকে ফুরফুরা শরীফে জানাজা ও দাফন করা হয়। দাদা হুজুর কেবলার ইনে-কালে তিনি যে কথা বলে ছিলেন। মাত্র ২৩ মাস পরে তাঁর জানাজায় স্বাভাবিক (ঈসালে সওয়াবের জন্য) কারণে বেশী লোকের সমাগম হয়।

তাঁর মাজার শরীফ দাদা হুজুর কেবলার মাজারের গম্বুজের বাহিরে উত্তর দিকে নারিকেল গাছের পার্শ্বে বিদ্যমান ।


Copyright © www.furfurasharif.com ,২০১০, সর্ব্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত
এই ওয়েব সাইটের যে কোন তথ্যের বা অংশের কর্তৃপক্ষের বিনা আনুমতিতে অন্যত্র প্রকাশ, ব্যাবহার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন আইনতঃ নিষিদ্ধ।