মুফতিয়ে আযম আবুজাফর মোহাম্মদ অজিহুদ্দিন সিদ্দিকি (মেজলা হুজুর কেবলা) (রঃ)

সোমবার, ডিসেম্বর ২০, ২০১০

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

মুফতিয়ে আযম পীর আবুজাফর মোহাম্মদ অজিহুদ্দিন সিদ্দিকি (রঃ) মোজাদ্দেদে-জামান দাদা হুজুর কেবলা (রঃ) এর দ্বিতীয় সাহেবজাদা। এজন্যে তিনি মেজলা হুজুর পীর কেবলা নামে পরিচিত। তিনি ১৯০৬ সালের জানুয়ারী মাসের ৪ তারিখে ফুরফুরা শরীফে জন্মগ্রহন করেন।

শিক্ষা জীবন

মেজলা হুজুর কেবলা (রঃ) বাল্যকালে কোরআন শিক্ষা শেষ করে বাংলা শেখার জন্যে কিছুদিন মক্তবে অধ্যায়ন করেন। এর পর তিনি উর্দু প্রাথমিক পাঠ শেষ করে ফুরফুরা জুনিয়র মাদ্রাসায় ভর্তি হন। জুনিয়র মাদ্রাসার পাঠ শেষ করে ৪/৫ বছর খারেজি ভাবে নোহু, সরফ এবং আরবী, ফার্সী সাহিত্য অধ্যায়ন করেন। ১৬ বছর বয়সে ফুরফুরা মাদ্রাসার পাঠ শেষ করে তিনি সিনিয়র ও টাইটেল শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে ১৯২২ সালে কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন।

আরবী, ফার্সী ও উর্দু ভাষায় তিনি একজন সুপন্ডিত ছিলেন। তিনি মোজাদ্দেদে জামান (রঃ) এর নিজস্ব লাইব্রেরীতে সংগৃহীত কিতাব মোতায়ালা করতে থাকেন এবং তার কাছ থেকে ২০/২১ খানা কিতাবের সনদ লাভ করেন। ১৪ বছর মাদ্রাসা শিক্ষা সমাপ্ত করে দীর্ঘ ৫/৬ বছর বিভিন্ন ’কুতুব বিনি’ করতে থাকেন। দাদা হুজুর কেবলা (রঃ) মেজলা হুজুর কেবলা (রঃ) কে জমিয়তে উলামায়ে বাংলা আসাম এর মুফতি নিযুক্ত করেন।

আধ্যাত্মিক এবং কর্মময় জীবন

পীর মুর্শিদের জীবনে এলমে বাতেনী বা আধ্যাত্মিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সর্বশ্রেণীর মানুষের নিকট তা বিশেষ শিক্ষণীয় আদর্শ।

বাতেনী শিক্ষায় কামালত ও বেলায়েত লাভ করতে হলে উপযুক্ত শিক্ষক অর্থ্যাৎ পীর-মুর্শিদের প্রয়োজন। মেজলা হুজুর পীর কেবলার পীর ছিলেন আমিরুশ শরিয়াত মুজাদ্দেদে জামান শাহ সুফী মাওলানা মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দিকী আল কোরায়েশী (রঃ)। তার পরিচয় দেওয়ার মত ভাষাজ্ঞান আমাদের নেই, ক্ষমতাও নেই। এলমে জাহেরী ও বাতেনীতে আল্লাহপাক তাকে মুজাদ্দেদিয়াতের দরজা ও মর্যাদা দান করেছিলেন।

মেজলা হুযুর (রঃ) তাহার ওয়ালেদ কেবলার জিকিরের মজলিসে হাজির থেকে ধারাবাহিকভাবে তরিকা অনুযায়ী বাতেনী এলমের অজিফাসমুহ মশক করেন। তাঁর ওয়ালেন সাহেব তাঁকে অজিফা পরিবর্তন করে দিতেন। এভাবেই তিনি দাদা হুজুর কেবলা (রঃ) নিকট হইতে মিরায়াতের সবক পর্যন্ত শিক্ষা নিয়াছিলেন।

১৪/১৫ বছর ব্যাপী তাঁর নিকট এভাবে শিক্ষা লাভ করে মুর্শিদ কেবলা চার তরিকার এজাজত প্রাপ্ত হন। বাতেনী শিক্ষারত অবস্হায় তাঁকে তাঁর ওয়ালেদ কেবলা দুইবার ‘এলমে লাদ্দুনী’র ফয়েয প্রদান করিয়াছিলেন। কঠোর সাধ্য-সাধনার ফলে তিনি কামালাত ও খেলাফত প্রাপ্ত হন।বাস্তব জীবনেও আমরা সেদিনের অনুশীলনের প্রতিফলন দেখতে পাই। প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যা মোরাকাবা মোশাহাদা করা ও মুরিদের করানো তাঁর নিত্য নিয়ম ছিল। তিনি একজন উচ্চ দর্জার ওয়ালীয়ে কামেল ছিলেন।

তিনি তাঁর জীবনকালে বহু বই-পুস্তক লিখেছেন এবং তাঁর আদেশ ও যত্নে প্রকাশিত হয়েছে। তাবাকাতুল-এজাম(উর্দু), মিল্লাতুল মোগিস (উর্দু), আল-মৌজুয়াত (উর্দু), নসিহাতুন্নবী, তাহাকিকুল মাসায়েল প্রভৃতি শতাধিক পুস্তকের তিনি প্রনেতা ছিলেন। তিনি সুন্নাতল জামায়াতের অন্যতম হাতিয়ার ছিলেন, একথা বলার অবকাশ রাখে না। এলমে জাহেরী তথা শারিয়াতের রেসম-রেওয়াজ, বেদাত-বাতিল এবং এলমে বাতেন তথা এলমে মারেফাতের অতি বাড়াবাড়ি সম্বন্ধে তাঁর কেতাব ও মতামত অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ। বিশেষ করে এখতেলাফ মাসায়েল তাঁর কেতাব প্রমাণ্য দলিল, মজবুত হাতিয়ার ছিল।

মেজলা হুজুর কেবলার ওয়াজ নাসিয়াতের জলসা হতে বিভিন্ন প্রকার শিক্ষা ও উপকার পাওয়া যেত—

১। তার ওয়াজ শুনে আখেরাতই যে মানুষের জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য-এর গুরুত্ব উপলব্দি করে শ্রোতারা খোদা ভীরু হতেন।

২। বাতেনী শিক্ষা যে প্রত্যেক মুসালমানের জীবনের জন্য অপরিহার্য, সে বিষয়ে মোটামুটি জ্ঞান লাভ করে মানুষ তরিকা শিক্ষার জন্য ঝুঁকে পড়তো।

৩। বড় বড় জলসার মাধ্যমে কোরআন ও হাদিস হতে একাধিক দলিল প্রমাণ প্রদান করে এলম বা শিক্ষার গুরুত্ব এবং সে সঙ্গে গ্রামে গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মক্তব-মাদ্রাসা ও মাসজিদ গড়ে তুলতে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

৪। তার ওয়াজ নাসিয়াত শুনে সর্বশ্রেণীর মানুষ ব্যাপকভাবে অশান্ত মনে প্রশান্তি ও স্বস্তি লাভ করতেন।

৫। তার সভায় মুসালমানেরা মাসলা-মাসায়েল, হালাল-হারাম প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতো।

মুজাদ্দেদে-যামান (রঃ)-এর কদম-ব-কদম চলনেওয়ালা মেজলা হুজুর কেবলা ফুরফুরা শারীফের প্রতিটি উন্নয়ন মূলক কাজে অংশ গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে মাজার শারীফের গেট, একদিকের পুকুরের বাধানো ঘাট, মাদ্রাসার প্রাচির, মাদানী মসজিদ সংরক্ষণ, টিনের ঘরের মিম্বার পুনঃসংস্কার মেজ হুজুর পীর কেবলা (রঃ)-এর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছিল।

শেষ সফর

মুফতীয়ে আযম অলীয়ে কামেল শাহ সুফী, পীর হজরত আবু জফর সিদ্দিকী (রঃ) মহান  আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে ১০০ বছর বয়সে ২০০২ সালের ২৯শে অক্টোবর, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭ টা ২০ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।


Copyright © www.furfurasharif.com ,২০১০, সর্ব্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত
এই ওয়েব সাইটের যে কোন তথ্যের বা অংশের কর্তৃপক্ষের বিনা আনুমতিতে অন্যত্র প্রকাশ, ব্যাবহার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন আইনতঃ নিষিদ্ধ।