সুলতানুল আরেফীন ওলিয়ে মাদারজাত মাওলানা আবু নজম মোঃ নাজমুস সায়াদাত সিদ্দিকী (ন’হুজুর কেবলা) (রঃ)

সোমবার, ডিসেম্বর ২০, ২০১০

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

সুলতানুল আরেফীন ওলিয়ে মাদারজাত, গাউসে-সামদানী, মাহবুবে-সোবহানী হযরত মাওলানা শাহ সুফী আবু নজম মোঃ নাজমুস সায়াদাত সিদ্দিকী (রঃ) মোজাদ্দেদে-জামান, কুতুবুল-আলম, দাদা হুজুর হযরত পীর মাওলানা আবুবকর সিদ্দিকী (রঃ) এর চতুর্থ সাহেবজাদা ছিলেন। তিনি ”ন’হুজুর পীর কেবলা” নামে মসহুর। ন’হুজুর পীর কেবলা (রঃ)  ১৩৩৩ রবিউল আওয়াল মাসের এক সুবাহ্‌-সাদেকে জম্মগ্রহন করেন।

অলৌকিক জন্ম

হুজুরের বেলাদাত বা জন্মের সময় দাদীজী তিনদিন অত্যাধিক প্রসব বেদনায় কাতর হয়ে ফজরের সময় পুত্র সন্তান প্রসব করেন। সন্তান হওয়ার পর স্বাভাবিক নড়াচড়া বা কাঁন্নার শব্দ না পেয়ে সকলের ধারণা হয় মৃত সন্তান হয়েছে। বাড়িতে হৈ চৈ পড়ে গেল, পাড়া প্রতিবেশী সকলেই বললো- মরা ছেলে হয়েছে। সে ধারণায় শিশু ন’হুজুরকে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হলো। সকলের তুলনায় দাদীজী অত্যধিক বিচলিত হয়ে পড়েন; কিন’ দাদা হুজুর কেবলা (রঃ) বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সকলে মাইয়েতের দাফন-কাফনের ব্যবস্হার জন্য দাদা হুজুর কেবলার অনুমতি চাইলে, তিনি বলেন-” তোমরা ব্যস- হয়োনা, যা করার আসর বাদ করা হবে।”

এদিকে দাদীজী অসি’র হয়ে বিশিষ্ট কাশ্‌ফ শক্তি সম্পন্ন ওলি, হযরত সুফী তোজাম্মেল হোসেন সিদ্দিকী সাহেবকে কাশ্‌ফ করে জানার জন্য ডেকে পাঠান। জোহর বাদ সুফী সাহেব কাশ্‌ফ করে বলেন-” না, আম্মাজান এ ছেলের জান নেই, মরা ছেলেই হয়েছে।”

আল্লাহপাকের মহান ইচ্ছা, আসরের সময় হঠাৎ কাপড় ঢাকা শিশুটি তিনবার অস্পস্ট অভুতপূর্ব শব্দে করে উঠে। সবাই অবাক হয়ে ধীর সি’র ভাবে চেয়ে থাকে। অতঃপর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বাভাবিক কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। কিছু বোঝার আগেই শিশুটি কাপড়ের ভিতর নড়ে উঠলো। তখন কাপড় সরিয়ে লোকে তাঁকে কোলে তুলে নিলো। পাড়া প্রতিবেশী ছুটে  এলো। বাড়িতে মহা এক আনন্দ উৎসব পড়ে গেল। দাদা হুজুর কেবলা এবং উপসি’ত সবাই আল্লাহর মহান কুদরতের শুকরিয়া আদায় করলেন। এ ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে, ন’হুজুর পীর কেবলা (রঃ) মাতৃগর্ভ থেকেই আল্লাহর ওলি হয়েই পৃথিবীতে এসেছিলেন। জন্ম লগ্নেই যার এরূপ ঘটনা তাঁর আধ্যাত্বিকতার ও শ্রম সাধনার ইতিহাস কি হতে পারে তা বিশেষ ভাবে অনুধাবনযোগ্য।

হুজুর কেবলার বাল্য ও শিক্ষা জীবন

একটা প্রবাদ বাক্য আমাদের সকলেরই জানা আছে সেটা হল, Morning shows the day অর্থাৎ সকাল দেখলে বোঝা যায় সারাদিনটা কেমন যাবে। তেমনি মানুষের জীবনের ক্ষেত্রেও এর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। প্রতিটি মানুষের জীবনের শুরুতেই ভবিষ্যৎ জীবনের রেখাপাত হয়। হযরত ন’হুজুর কেবলা (রঃ)- এর শৈশব ও কৈশোরের ঘটনাবলীই তাঁর সব থেকে বড় প্রমাণ। বড় হয়ে তিনি যে একজন বিরাট কিছূ হবেন এটা বাল্যকালেই বোঝা গিয়েছিল। তিনি ছিলেন মাদারজাত ওলী। শিশু ন’হুজুর ছিলেন যেমন এক গোপন গৌরবে উজ্জ্বল তেমনি তাঁর শিশুসুলভ আচরনেও ছিল মুগ্ধতার ছোঁয়া। শৈশব থেকেই তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলটি যেন বিশেষ ভাব মন্ডিত হয়ে উঠেছিল।

দুরন্ত সেই শৈশবের ন’হুজুর মানুষকে চমকে দিয়ে যেদিন কৈশোরে পা দিলেন, তখন তিনি এক অন্য বালক।  আচার-আচরন ও আদব-আখলাকে তিনি অন্যান্য বালকদের চেয়ে সম্পূর্ন স্বতন্ত্র। কোন এক অপার্থিব টানে অন্য সব ছেলেদের কাছ থেকে ক্রমশঃ দুরে সরে যেতে লাগলেন তিনি। বহুমুখী প্রতিভায় বিকশিত ছিল তাঁর কৈশোর জীবন। সকলের প্রতি গভীর ভালবাসা, মিষ্টি স্বভাব, বড়দের প্রতি আদব আখলাক এবং গরীব মানুষের প্রতি এক নিবিড় টান তাঁর কৈশোর জীবনকে অলংকৃত করেছিল। খেলাধুলাও করেতন তিনি। লাঠি খেলা, তলোয়ার খেলা ও তীর ছোঁড়া ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। ঘোড়ায় চড়তে ভালবাসতেন বলে একটি ঘোড়াও কিনেছিলেন। তার সব কাজেই সুন্নতি স্বভাব প্রস্ফুটিত হয়েছিল। বাল্য জীবনের ছোট একটি ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, তিনি জন্ম লগ্ন থেকেই তিনি আল্লাহর সান্নিধ্য প্রাপ্ত হয়েছিলেন। একদিন দাদা হুজুর কেবলার (রঃ) কাছে তাঁরই এক সহোদর ন’হুজুরের শিশুসুলভ দুষ্টুমীর অভিযোগ করলে দাদা হুজুর বলেছিলেন-“বাবা এ ছেলে আমার মাদারজাত ওলী।ওসব ঠিক হয়ে যাবে।” অতএব হযরত ন’হুজুর কেবলার (রঃ) এর বাল্য-জীবন যে সমস- মানুষকে আকৃষ্ট করবে তাতে আর সন্দেহ কি ?

জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। এখানে জ্ঞান অর্থে জাহেরী ও বাতেনী উভয় জ্ঞানকেই বুঝায়। ন’হুজুর পীর কেবলার জীবনে এই দুই শিক্ষার প্রভাব কোন অংশে কম ছিলনা। জাহেরী এলেম শিক্ষা করতে মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তার স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন- প্রখর। ফুরফুরা শরীফের প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য কোলকাতার ‘মাদ্রাসা-এ- আলিয়ায়’ তিনি অধ্যয়ন শুরু করেন। সুন্দর আদব-আখলাক এর কারনে তিনি সকল শিক্ষকের স্নেহধন্য হয়ে উঠেছিলেন। পাঠ্য-জীবন থেকেই পীর কেবলার রেজায়ে মাওলার সাধ্য-সাধনা শুরু হয়।

ন’হুজুর কেবলা একবার বলেছেন, ”কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ফাজেল পড়ার পর আমি সম্পূর্ণরূপে আধ্যাত্মিক বিদ্যায় মনোনিবেশের জন্য তোমাদের দাদা হুজুরকে বারংবার বলি। তিনি না শোনায়, তোমাদের দাদী-আম্মাদের মাধ্যমেও বলাই। দাদা হুজুর কেবলার বক্তব্য ”ও (ন’হুজুর) আরও জাহেরী এলেম শিখুক।” সে সময় আমি কোলকাতায় অবস’ান করি, আর তোমাদের দাদা পীর (হযরত ফতেহ্‌ আলী ওয়ায়েসী (রঃ) )-এর মাজারে ক্রমাগত আরজ করতে থাকি, আমাকে ফায়েজ দেয়ার জন্য। অনেক  কথোপকথনের পর, তিনি রাজি হয়ে আমাকে ফায়েজ দেন। তাঁর পরামর্শমত নির্জন স্থানে গিয়ে সবক মশ্‌ক করতে থাকি। এদিকে কাউকে না বলে যাওয়ায় বাড়িতে  খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে যায়। পরবর্তীতে দাদা হুজুরের কাছে আসলে তিনি আমাকে নিরালায় জিজ্ঞাসা করেন, দাদা পীর (রঃ) তোমায় কি ফায়েজ দিয়েছেন? আমি বললাম, “ফায়েজে এত্তেহাদি”। একথা শুনে হুজুর কেবলার চেহারা অত্যন- হাস্যোজ্জল হয়ে যায়। এবং তিনি বলেন, আমার পীর তাঁর জীবদ্দশায় চারজনকে ফায়েজে এত্তেহাদি দান করেছেন, আর তাঁহার ইনে–কালের পর তোমায় দিলেন, আমরা মোট পাঁচজন হলাম। তারপর থেকে তোমাদের দাদা হুজুরের সোহবতে থেকে সলুক সমাপ্ত করি।”

মাওলানা গুলজার হোসেন সাহেব একবার হুজুর কেবলাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ঐ চারজন মহৎ ব্যাক্তি কারা। হুজুর কেবলা (রঃ) বলেন, (১) সৈয়দ মাওলানা একরামুল হক, মুর্শিদাবাদী। (২) মাওলানা আব্দুল হক সিদ্দিকী, শিজগ্রামী। (৩) মাওলানা গোলাম সালমানী আব্বাসী, ফুরফুরাভী। (৪) মোজাদ্দেদে জামান মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী ফুরফুরাভী (রঃ)।

হুজুর কেবলার স্বভাব ও  চরিত্র

“নিশ্চয় আল্লাহর রসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য সুন্দর আদর্শ বা নমুনা বিদ্যমান।” (কোরআন দ্রঃ) আমরা নবীকে দেখিনি, কিন’ নায়েবে নবী হজরত ন’হুজুর কেবলাকে দেখে নবীপাক (সঃ)-এর আদর্শকে গভীর ভাবে উপলদ্ধি করার সুযোগ পেয়েছি। ন’হুজুর কেবলার সমস- জীবনটাই ছিল মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর আদর্শে অনুপ্রাণীত। তাঁর স্বভাব-চরিত্র ছিল জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য অনুকরনীয় ও আনুসরনীয়।

মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর কাছে ছোট-বড়, উচু-নীচুর কোন প্রভেদ ছিল না; জাতিভেদ বা বৈরীতারও ঠাঁই ছিল না। তেমনি নায়েবে নবী ন’হুজুর কেবলা (রঃ)-এর জীবনেও দেখেছি ঐ আদর্শের পুনরাবৃত্তি। তাঁর প্রশস- বুকে একজন মুসলমান যেমন স্হান পেতেন ঠিক তেমনি একজন হিন্দু বা খৃষ্টানও স্হান পেতেন নিঃসঙ্কোচে। একজন ধনী বা অবস্হাপন্ন ব্যক্তিকে তিনি যেমন কাছে টেনে বসাতেন ঠিক তেমনি গরীব-দুস্হ্য, সাওতাল ও বাগদিকেও হাত ধরে নিজের কাছে বসাতেন। এমনভাবে আপন করে নিতেন যে, সে ভালবাসার কথা কেউ কোনদিন ভুলতে পারতো না। তাঁর কাছে এসেছেন অথচ আতর না নিয়ে ফিরেছেন এমন কোন ব্যক্তি আছেন বলে মনে হয় না।

হজরত মোহাম্মদ (সঃ) ছিলেন শিশুদের নবী, যুবকের নবী ও বৃদ্ধদেরও নবী। বয়সের গন্ডী তাঁর কাছে সীমারেখা টানতে পারেনি। ঠিক সেই রকমভাবে সুলতানুল আরেফিন নায়েবে নবী হজরত নাজমুস সায়াদাত সিদ্দিকীকেও দেখা যায় কখনও তিনি শিশুদের সাথে পরিবেষ্টিত হয়ে খেলছেন, কখনও যুবকদের হিতোপদেশ দিচ্ছেন, কখনও বা বৃদ্ধরা তাঁর সাহায্য পেয়ে ধন্য হয়েছেন। তাঁর সদাহাস্য সম্বোধন মানুষকে এমনিই বিমোহিত করতো।

ন’হুজুর কেবলার সবার প্রতি যে গভীর ভালবাসা ছিল তা এ জগতে বিরল। মানুষের প্রতি তাঁর এই গভীর ভালবাসা, সরল ব্যবহার, আত্মিক নিবিড়তা, হূদয়ের মর্মস্পর্শী টান তাঁকে সমাজের সর্বস-রে সমান মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। তাই তাঁর ইনে-কালের পরও বহুদিন পর্যন- বহু মানুষকে চোখের পানি ফেলতে দেখা যায়।

মাদারজাত ওলীয়ে কামেল ন’হুজুর পীর কেবলা (রঃ) কে যাঁরা একবার অন্তরের চোখে দেখেছেন তাঁরা বুঝতে পেরেছেন সারা দুনিয়া কি অমূল্য জিনিস হারিয়েছে, এ ক্ষতি অপূরণীয়।

কর্মময় জীবন

দাদা হুজুর কেবলা একদিন তাঁকে বললেন এ ভাবে বেকার না থেকে তুমি একটা চাকরি কর। দাদা হুজুর কেবলার সুপারিশে কলকাতার মুচিপাড়া ও বড়বাজার থানা এলাকার-“মুসলিম ম্যারেজ রেজিষ্টার ও কাজী” পদে চকরী হয়ে গেল। তিনি কিছুদিন চাকরী করলেন, তারপর হঠাৎ একদিন চাকরী ছেড়ে দিয়ে বাড়ী চলে এলেন। দাদা হুজুর কেবলা বললেন-“কি হল, চাকরী ছেড়ে দিলে?” তিনি বললেন, “আমার মোকসেদ পুরা হয়ে গেছে, তাই ছেড়ে দিলাম।” আসলে তাঁর দুটি মোকসেদ ছিল, একটা হল আব্বা হুজুরের হুকুম তালিম করা, আর দ্বিতীয়টা আরও বড় মোকসেদ যে, এই সুযোগে একটা সুন্নত আদায় করা।

এরপর হজরত ন’হুজুর কেবলা বাড়ীতেই অধিক সময় কাটাতেন। মাঝে মাঝে বন্দুক নিয়ে পাখি শিকারে বার হতেন। বন্দুকের নিসানায় লক্ষ্যভ্রষ্ট খুবই কম হত। ভোরবেলায় বার হয়ে বৈকাল পর্যন্ত কয়েক মাইল খাল, বিল, মাঠ ঘুরেই একরাশ পাখী নিয়ে বাড়ী ফিরতেন।

দাদা হুজুর কেবলা সব দেখতেন, শুনতেন কোন কিছু বলতেন না। অন্যান্য হুজুর কেবলাগণ দাদা হুজুর কেবলার সঙ্গে বাংলা আসামের বিভিন্ন জেলার ওয়াজ নসিহতের জলসা করে বেড়াতেন। খুব সফর করতেন, কিন্তু হজরত ন’হুজুর কেবলা কোথাও যেতেন না। ওয়াজ নসিহতও খুব একটা করতেন না। এই ছেলেটি একেবারে এভাবেই থাকবে, এটাও তিনি পছন্দ করতেন না। তাই মাঝে মাঝে সফরে যাবেন কিনা জিজ্ঞাসা করলে  তিনি এড়িয়ে তাকতেন, যাবার আগ্রহ প্রকাশ করতেন না।

এ সময় হঠাৎ একদিন দাদা হুজুর কেবলা, হজরত ন’হুজুর কেবলাকে ডেকে বললেন, ”সফরেও যাবে না, ওয়াজ নসিহত করতেও বার হবেনা। তাহলে বেকার না থেকে আমার জমিদারী দেখাশুনার ভার নাও।” এই বলে সেরেস্তাখানায় বসা সমস্ত গোমস্তা, সরকার, তহশীলদার, পাইকদের ডেকে বলে দিলেন, ”আজ থেকে জমিদারী বিষয়ে যাবতীয় কাজ আমার এই ছেলে দেখাশুনা করবে। আপনারা যাবতীয় হিসাব একে বুঝাবেন।” ঐ দিন হতে ন’হুজুর পীর কেবলা (রঃ) জমিদারীর যাবতীয় কাজ দেখাশুনা করতে লাগলেন। একারনেই বৈষয়িক যাবতীয় জরুরী দলিল-দস্তাবেজ, কাগজ-পত্র এমনকি তার একাধিক ওয়াক্‌ফ এষ্টেটের হিসাব নিকাশের কাগজ-পত্রও তারই হেফাজতে থাকত।

এ সময় দাদা হুজুর কেবলা (রঃ) তাঁর ওপর একটি মহান কাজের দায়িত্ব দিলেন। হঠাৎ ফাল্গুন মাসের ঈসালে সওয়াবের কয়েকদিন আগে তাকে ডেকে বললেন, ’এবছর হতে ঈসালে সওয়াবের আয়-ব্যায়, হিসাব-নিকাশ দেখাশুনার কাজ তোমার জিম্মায় থাকবে।” – হজরত ন’হুজুর কেবলার তখন পূর্ণ যৌবন, অটুট স্বাস্থ্য, উদ্যম-উৎসাহে ভরপুর দারুন কর্মঠ। কাজেই এ মহান কাজের দায়িত্ব তিনি হাসিমুখেই গ্রহণ করলেন। প্রতিটি কাজ তিনি যথেষ্ট দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে আঞ্জাম দিতে লাগলেন। দাদা হুজুর কেবলাও তাঁর যোগ্যতা বুঝে একের পর এক কাজের দায়িত্ব তার উপর অর্পন করতে লাগলেন।

এরপর তিনি কিছুদিন মাথায় বাবরী চুল রাখতে শুরু করলেন। এতে তার মধ্যে একটা উজ্জ্বল গাম্ভীর্য ভাব ফুটে উঠল। আধ্যাত্বিকতায় তাঁর কামালিয়াতের কথা পূর্বেই সবার জানা ছিল। কাজেই মোজাদ্দেদে জামানের দরবারে আগত অগণিত সূফী, দরবেশ, আবেদ, ফকির-মাস্তান সবাই তাকে খুব সমীহ  করে চলতো। তিনি অনেক সময় জালালি হালতে ঐ সব মুরিদ পীর ভাইদের আমলের খুলুসিয়াত ও কামালিয়াত যাচাই করে দেখতেন। অনেককেই ধমক দিতেন, সংশোধনের জন্য নসিহত করতেন। আবার কাউকে তাদের ভুল বুঝিয়ে দিতেন। ফলে তারা অল্প মেহনতে অধিক লাভবান হতো।

শেষ সফর

শায়খুত্তারিকত, সুলতানুল আরেফীন, ওলিয়ে মাদারজাত, গাউসে-সামদানী, মাহবুবে-সোবহানী হযরত মাওলানা শাহ সুফী আবু নজম মোঃ নাজমুস সায়াদাত সিদ্দিকী (রঃ) ১৯৮২ সালের ৭ই জানুয়ারী (১১ই রবিউল আওয়াল ১৪০২ হিজরী) বৃহস্পতিবার বেলা ২ টা ৩০ মিনিটে  ৬৯ বছর বয়সে ফুরফুরা শরীফের নিজ বাড়িতে ইনে-কাল করেন। -ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।

মুহূর্তেই দুরদুরান- থেকে মানুষ আসতে শুরু  হলো। লোকের আসার আর বিরাম নেই। ফুরফুরা শরীফের মাটি যেন কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। ১২ই রবিউল আওয়াল শুক্রবার সেই একই অবস’ায় কাটল। মুরিদ মোতাকেদিনদের ভিড়ে কারো এক কদম এগিয়ে যাবার উপায় নেই। লোক যেন উপচে পড়ছে। শেষ দেখা দেখতে চাইছে তাদের প্রাণের পীর কেবলাকে।

১১ই রবিউল আউয়াল বৃহস্পতিবার থেকেই লোকের সমাগম শুরু হয়েছে অসি’র উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। ১৩ই রবিউল আওয়াল শনিবার সেই অসি’রতার লেশ মাত্র নেই। কারণ ঐ দিনটিই নামাজে জানাজার দিন, হুজুর কেবলাকে দাফন করার দিন। দরবার শরীফে তাজিমের সঙ্গে লাশ মোবারক শোয়ানো আছে। শুধু মুখের কাপড়টা একুট সরানো। হাজার হাজার মানুষ লাইন দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে একের পর এক তাদের হুজুর কেবলাকে দু’চোখের নীরব ফল্গুধারায় গভীর বেদনার অব্যক্ত ভালবাসা দিয়ে শেষ বিদায় জানালো।

ধীরে ধীরে দুপুর হ’ল। জোহরের নামাজ পড়াও শেষ হল। তারপরই শুরু হল নামাজে জানাজার জন্য কাতার দেবার পালা। ময়দান, বড় পাকা রাস্তা, দু’পাশের ফাঁকা ঘরবাড়ী, বাড়ীর ছাদ, বারান্দা, সবকিছুই লোকে লোকারন্য। সে এক অভুতপূর্ব দৃশ্য। চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না। ন’হুজুর পীর কেবলা (রঃ)-এর লাশ মোবারক নিয়ে যাওয়া হল বড় রাস-ায়। লক্ষ মানুষের নিঃশব্দ জনসমুদ্রে জানাজা নামাজের ইমাম হলেন মুফতিয়ে বাংলা-আসাম  মেজলা হুজুর পীর কেবলা হযরত আবু জাফর সিদ্দিকী (রঃ)। জানাজার পর সওয়াব রেসানী করতে এলেন ছোট হুজুর পীর কেবলা হযরত জুলফিক্কার আলী সিদ্দিকী (রঃ)। লক্ষ লক্ষ মানুষের হাত উঠল আল্লাহরাব্বুল আলামিনের দরবারে। অশ্রুসিক্ত সে আরজি আল্লাহর দরবারে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর শুরু হলে শেষ দেখা। একের পর এক শেষবারের মতো হুজুর কেবলাকে এক পলক দেখে নিয়ে এক বেহেস্তী অনুভূতি তারা যেন হূদয়ে গেঁথে নিতে চাইছে।

এক সময় ভীড় একটু হালকা হলে, শুরু হল শেষ যাত্রা। স্নেহ-ধন্য পরিজনেরা তাঁকে মুজাদ্দেদে জামান দাদা হুজুর কেবলা (রঃ)-এর বাম পাশে তাজিমের সঙ্গে শুইয়ে দিয়ে এলেন।

Copyright © www.furfurasharif.com ,২০১০, সর্ব্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত
এই ওয়েব সাইটের যে কোন তথ্যের বা অংশের কর্তৃপক্ষের বিনা আনুমতিতে অন্যত্র প্রকাশ, ব্যাবহার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন আইনতঃ নিষিদ্ধ।